এবার সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরির কথা জানিয়েছে পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস (পিআইআইই)। সংস্থাটির মতে, আগামী পাঁচ বছরে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। এর মধ্যে প্রথম বছরেই ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৬৮৬ বিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস গত ১১ জুন এল নিনোর আগমনের ঘোষণা দেয়। প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট একটি অংশের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনাই এল নিনো। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতকে এটি প্রভাবিত করে।
পিআইআইইর জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার এল নিনো বেশ শক্তিশালী হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনকি ১৯৯৭-৯৮ সালের মতো ‘সুপার এল নিনো’ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা এখনই ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী পাঁচ বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে বলে জানায় গবেষণা সংস্থাটি।
গবেষক কালেন এস হেন্ড্রিক্স বলেন, ‘এল নিনোর প্রভাব অবশ্য সব দেশে সমান হবে না। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। এসব দেশের অর্থনীতি আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল।’
এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে একুয়েডর, পেরু, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সুরিনাম, পানামা, নিকারাগুয়া, টোগো, জাম্বিয়া ও কোস্টারিকা। এসব দেশের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলের উষ্ণতার পরিবর্তনের সঙ্গে বেশি মাত্রায় ওঠানামা করে।
প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রথম বছর এল নিনোর সম্ভাব্য মোট ক্ষতির মধ্যে ৫৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারই ৫১টি দেশে কেন্দ্রীভূত হতে পারে। এসব দেশের সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ হিসাবের পেছনে রয়েছে এল নিনোর কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার বিভিন্ন প্রভাব।
গবেষক ক্রিস্টোফার কলাহান ও জাস্টিন ম্যানকিন ২০২৩ সালে এল নিনোর কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণ করেন। ১৯৬০-২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্য ব্যবহার করে তারা এ গবেষণা করেন।
তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এল নিনোর প্রভাব শুধু ঘটনার বছরেই অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। এর প্রভাব পরবর্তী কয়েক বছরেও থাকে। কারণ এল নিনোর ফলে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। বিনিয়োগ কমলে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও দুর্বল হয়।
এবারের সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব হিসাব করতে ওই গবেষণার কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে প্রায় ৮৮টি দেশকে। এসব দেশ আবহাওয়ার দিক থেকে এল নিনোর সঙ্গে শক্তিশালী বা মাঝারি মাত্রায় সংযুক্ত।
এল নিনোর অর্থনৈতিক প্রভাবের অন্যতম বড় ক্ষেত্র কৃষি। অতিরিক্ত বৃষ্টি, বন্যা বা খরার কারণে ফসল নষ্ট হতে পারে। এতে কৃষকের আয় কমবে। একই সঙ্গে খাদ্য আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। তখন বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ খাদ্য আমদানিতে ব্যয় হবে। এতে উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগে অর্থ কমে যাবে।
বন্যা ও ভূমিধসের প্রভাবও বড় হতে পারে বলে জানিয়েছে পিআইআইই। এসব দুর্যোগে সড়ক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে নতুন অবকাঠামো, শিক্ষা বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে সরকারের ব্যয়ের সুযোগ কমে যায়।
এর সঙ্গে রয়েছে ঋণের চাপ। এল নিনোর কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন অনেক দেশ এরই মধ্যে কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে বড় ধরনের ঋণের বোঝা বহন করছে। ফলে দুর্যোগের সময় অর্থনীতি সামাল দিতে সরকারের হাতে অতিরিক্ত অর্থের সুযোগ সীমিত। এতে এল নিনোর ধাক্কা আরো দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকিও বাড়তে পারে। খাদ্য, কর্মসংস্থান ও সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়লে সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব আবার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়তে পারে।
এরই মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতি আরো কিছু চাপের মধ্যে রয়েছে। নথির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি প্রায় পাঁচ মাস ধরে বন্ধ থাকার প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে ও সারের সরবরাহে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এল নিনোর কারণে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে এর সঙ্গে যোগ হতে পারে খাদ্যমূল্যের নতুন চাপ। বিশেষ করে ২০২৬ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে নিত্যপণ্যসহ খাবারের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের পুরো ক্ষতি অনিবার্য নয়। বিশ্লেষণ বলছে, প্রথম বছরের ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো কঠিন। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোয় সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর সুযোগ রয়েছে। এজন্য এখনই প্রস্তুতি নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।